
ঢাকার বেশিরভাগ ভবনের পয়ঃবর্জ্য কোনো শোধনাগারে যায় না। ঢাকা ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা শহরের সীমিত একটি অংশকে সেবা প্রদান করে; বাকি ভবনগুলোর বর্জ্য সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল হয়ে মাটিতে, অথবা সরাসরি ড্রেন ও খাল হয়ে নদীতে গিয়ে পড়ে — যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থাকে অপরিশোধিত অবস্থায়
তিনটি সম্ভাব্য গন্তব্য
আপনার আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের বর্জ্য এই তিনটির যেকোনো একটি পথে যাচ্ছে।
১. ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন হয়ে শোধনাগারে – সাধারণত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় এটিই আদর্শ পথ, কিন্তু ঢাকায় সবচেয়ে কম প্রচলিত। ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, শহরের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা তাদের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। ২০২৫ সালে ডেইলি স্টারে নগর বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য আরও কঠোর — তাঁদের মতে ঢাকার ৯০ শতাংশের বেশি এলাকায় যথাযথ সুয়ারেজ ব্যবস্থা নেই।
২. সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল হয়ে মাটিতে – ঢাকার অধিকাংশ ভবনের পয়ঃনিষ্কাশন প্রকৃত ব্যবস্থাপনা এটাই । সেপটিক ট্যাংক কঠিন বর্জ্য আলাদা করে, আংশিক পচন ঘটায়, তারপর বাকি পানি সোক ওয়েল হয়ে মাটিতে চলে যায়। কিন্তু সেপটিক ট্যাংক কোনো শোধনাগার হিসেবে কাজ করে না এবং এটি বর্জ্যকে নিরাপদ মাত্রায় করতে পারে না । ঢাকার ঘনবসতি ও উঁচু ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের কারণে সোক ওয়েল অনেক জায়গায় মূলত অকার্যকর।
৩. সরাসরি স্টর্ম ড্রেন – ঢাকা শহরে বহু ভবনে পয়ঃলাইন সরাসরি বৃষ্টির পানির ড্রেনে যুক্ত করা আছে। এই ড্রেন বিভিন্ন খাল হয়ে নদী যেমন, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা বা বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ে। এটি অবৈধ, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি পয়ঃনিষ্কাশনের অন্যতম ব্যবস্থা, যা গুলশান লেক সহ অন্য লেকের দূষণের প্রধান কারণগুলোর একটি।
দাশেরকান্দি ও পাগলা সুয়ারেজ শোধনাগারের বাস্তব চিত্র
ঢাকার দুটি কার্যকর পয়ঃশোধনাগার নিয়ে অনেকের ধারণা বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় কিছুটা বেশি আশাবাদী।
দাশেরকান্দি STP: ৫০০ MLD পয়ঃশোধন ক্ষমতা নিয়ে শোধনাগারটি ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর সেবা এলাকার আওতায় রয়েছে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা | গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা, বাড্ডা, ভাটারা, বনশ্রী, কুড়িল, সংসদ ভবন এলাকা, ফার্মগেট, তেজগাঁও, আফতাবনগর, নিকেতন ও হাতিরঝিল।
তবে আইএমইডি-র ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাতে ডেইলি স্টার জানায়, শুষ্ক মৌসুমে প্ল্যান্টটি দিনে প্রায় ২৮০ MLD বর্জ্য শোধন করছে — অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় অর্ধেক। বর্ষায় প্রবাহ ৪৮০ MLD-তে উঠলেও তার বড় অংশই বৃষ্টির পানি, পয়ঃবর্জ্য নয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্ল্যান্টটি এখনো তার পরিকল্পিত সেবা এলাকার প্রায় এক-চতুর্থাংশের বর্জ্য শোধন করছে।
কারণটি খুবই সহজ: শোধনাগার তৈরি হলেও, সেখানে পয়ঃবর্জ্য পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন ও সংযোগ ব্যবস্থা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
পাগলা STP: দীর্ঘদিন ঢাকার একমাত্র শোধনাগার ছিল, ধারণক্ষমতা প্রায় ১২০ MLD। ২০২৫ সালে ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী এটি জরাজীর্ণ অবস্থায় ধারণক্ষমতার অর্ধেকেরও কম চালু আছে।
ঢাকা ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী উত্তরা, মিরপুর ও রায়েরবাজারে আরও শোধনাগার এবং পাগলার সংস্কার পরিকল্পনায় আছে। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে বছর খানেক লাগবে কিন্তু এই সময়টাতেও ভবনগুলো বর্জ্য উৎপাদন করেই যাচ্ছে।
আপনার ভবন কোন শ্রেণিতে পড়ে?
নিচের প্রশ্নগুলো দিয়ে দ্রুত যাচাই করতে পারেন:
- ভবনে কি সেপটিক ট্যাংক আছে? থাকলে আপনি ওয়াসার লাইনে যুক্ত নন।
- ওয়াসা থেকে কি আলাদা সুয়ারেজ বিল আসে? না এলে সংযোগ নেই ধরে নেওয়া নিরাপদ।
- সোক ওয়েল কি বর্ষায় উপচে পড়ে? পড়লে মাটি আর পানি নিচ্ছে না।
- পয়ঃলাইন কি ছাদের পানির ড্রেনের সঙ্গে যুক্ত? যুক্ত থাকলে বর্জ্য সরাসরি খালে যাচ্ছে।
- ট্যাংক কি ডিজাইনের চেয়ে বেশি মানুষ ব্যবহার করছে? করলে অপরিশোধিত বর্জ্য দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে।
নিশ্চিতভাবে জানতে ভবনের প্লাম্বিং ড্রয়িং দেখুন, কিংবা একজন প্রকৌশলীকে দিয়ে সাইট পরিদর্শন করান। অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
এর পরিণতি কী
অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য পরিবেশে মিশলে যা ঘটে:
- নদী ও খালের দূষণ — বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার অবস্থা এর সরাসরি ফল।
- লেকের মৃত্যু — গুলশান লেকের দীর্ঘমেয়াদি দূষণের পেছনে অবৈধ সংযোগ একটি বড় কারণ।
- ভূগর্ভস্থ পানিতে দূষণ — সোক ওয়েল দিয়ে বর্জ্য মাটিতে গেলে অগভীর জলস্তর ঝুঁকিতে পড়ে।
- জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি — পানিবাহিত রোগের বিস্তার বাড়ে।
- সম্পত্তির মূল্যে প্রভাব —দুর্গন্ধ ও পয়ঃবর্জ্য উপচে পড়ার সমস্যা ভাড়াটিয়া ধরে রাখা কঠিন করে তোলে।
নিয়ম কী বলছে
ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫-এর আওতায় রাজউক ভবন পর্যায়ে যথাযথ পয়ঃব্যবস্থাপনার উপর জোর দিয়েছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনের মতো এলাকায় সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল এবং প্রয়োজনে পূর্ণাঙ্গ STP-র চাহিদা সামনে এসেছে। শোধিত পানি ছাড়ার মান নির্ধারণ করে পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE)।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—আপনার নির্দিষ্ট ভবনের ক্ষেত্রে কোন নিয়ম বা ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে ভবনের অবস্থান, প্লটের আকার, ব্যবহারের ধরন এবং পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগের ওপর। তাই কোনো বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজউক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: গুলশান বনানী STP রুল ২০২৬ — রাজউকের শর্তাবলি
সমাধানের পথ: কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে বিকেন্দ্রীভূত পয়ঃশোধন ব্যবস্থার গ্রহণ
ঢাকার পূর্ণ সুয়ারেজ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে আরও অনেক বছর লাগবে। ততদিন পর্যন্ত বাস্তবসম্মত পথ হলো ভবন পর্যায়ে বিকেন্দ্রীভূত শোধন — অর্থাৎ যেখানে বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, সেখানেই শোধন করা।
জোকাসো (Johkasou) পয়ঃশোধন ব্যবস্থা মূলত তৈরি হয়েছে এমন পরিস্থিতির জন্যই। জাপানে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে সেইসব এলাকায়, যেখানে কেন্দ্রীয় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
- অ্যারোবিক শোধন — সেপটিক ট্যাংকের মতো আংশিক নয়, প্রকৃত পরিশোধন
- সিল করা FRP ইউনিট — মাটিতে শোষণের উপর নির্ভরশীল নয়
- কম্প্যাক্ট গঠন — পার্কিং বা বেসমেন্টের নিচে বসানো যায়
- পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানি — বাগান, ধোয়ামোছা ও ফ্লাশিংয়ে ব্যবহারযোগ্য
- বিদ্যমান ভবনে রেট্রোফিট সম্ভব
দাইকি অ্যাক্সিস বাংলাদেশ জাপানের দাইকি অ্যাক্সিস কোং-এর শতভাগ সহযোগী প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে আমরা ১০০টির বেশি জোকাসো STP স্থাপন করেছি গণপূর্ত অধিদপ্তরের আলীগঞ্জ সরকারি আবাসন (৪৫০ m³/দিন) ও টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (২৫০ m³/দিন) থেকে শুরু করে আবাসিক ভবন ও শিল্পকারখানা পর্যন্ত।
পরবর্তী ধাপ
প্রথম কাজ হলো নিশ্চিত হওয়া আপনার ভবনের বর্জ্য আসলে কোথায় যাচ্ছে। উত্তরটা জানা থাকলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনেক সহজ হয়ে যায়।
দাইকি অ্যাক্সিস বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করুন — আমরা আপনার ভবনের বিদ্যমান ব্যবস্থা মূল্যায়ন করে বাস্তবসম্মত সমাধান জানাব।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
আমার ভবন কি ঢাকা ওয়াসার সুয়ারেজ লাইনে যুক্ত?
সবচেয়ে সহজ ইঙ্গিত হলো সেপটিক ট্যাংক। ভবনে সেপটিক ট্যাংক থাকলে সাধারণত সুয়ারেজ সংযোগ নেই। ওয়াসার বিলে আলাদা সুয়ারেজ চার্জ আছে কি না দেখেও ধারণা পাওয়া যায়, তবে নিশ্চিত হতে ভবনের প্লাম্বিং ড্রয়িং দেখা বা ওয়াসার স্থানীয় অফিসে যাচাই করাই নির্ভরযোগ্য।
সেপটিক ট্যাংক থাকলে কি যথেষ্ট?
সেপটিক ট্যাংক শোধনাগার নয়। এটি কঠিন বর্জ্য আলাদা করে ও আংশিক পচন ঘটায়, কিন্তু নিঃসৃত পানিতে দূষণের মাত্রা তখনো অনেক বেশি থাকে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, বিশেষত সোক ওয়েল কার্যকর না হলে, শুধু সেপটিক ট্যাংক পর্যাপ্ত নয়।
ঢাকায় ভবনে STP কি বাধ্যতামূলক?
এটি নির্ভর করে ভবনের অবস্থান, আকার, ব্যবহারের ধরন এবং ওই এলাকায় সুয়ারেজ সংযোগ আছে কি না তার উপর। ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫-এর আওতায় রাজউক পয়ঃব্যবস্থাপনার উপর জোর দিয়েছে, তবে আপনার নির্দিষ্ট ভবনের জন্য কী প্রযোজ্য তা কারিগরি মূল্যায়ন ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
দাশেরকান্দি STP চালু হওয়ার পরও কেন সমস্যা রয়ে গেছে?
শোধনাগার নির্মিত হলেও বর্জ্য সেখানে পৌঁছে দেওয়ার সুয়ারেজ নেটওয়ার্ক এখনো অসম্পূর্ণ। আইএমইডি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী প্ল্যান্টটি শুষ্ক মৌসুমে ধারণক্ষমতার প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করছে, এবং পরিকল্পিত সেবা এলাকার বড় অংশ এখনো সংযুক্ত হয়নি।
বিদ্যমান পুরনো ভবনে STP বসানো কি সম্ভব?
হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব। কম্প্যাক্ট মডুলার STP পার্কিং এরিয়া, বেসমেন্ট বা ভবনের পাশের জায়গায় বসানো যায় এবং পুরনো RCC নির্মাণের তুলনায় অনেক কম ভাঙাচোরা লাগে। তবে প্রকৃত সম্ভাব্যতা নির্ভর করে জায়গা, বিদ্যমান পাইপলাইন ও ভবনের কাঠামোর উপর — সাইট পরিদর্শন ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যায় না।